বগুড়ার হিজড়া সম্প্রদায়

বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের আত্মকর্মসংস্থান উদ্যোগে জটিলতা, গ্রুপিংয়ে থমকে সমাজসেবার প্রশিক্ষণ

বগুড়ার হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনযাপন, আত্মকর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তা কার্যক্রমকে ঘিরে একদিকে যেমন রয়েছে নানা অভিযোগ, অন্যদিকে রয়েছে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টারও অনেক উদাহরণ। তবে গ্রুপিং, নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা এবং পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

সরকার ২০১৪ সালে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ভাতা ও পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করে। কিন্তু বগুড়ায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেছেন একদিকে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরা, অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরও বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরেছে।

বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের আত্মকর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম

বগুড়ার হিজড়া সম্প্রদায়ের নিবন্ধিত ৩৪৭ জন, দাবি আরও বেশি

বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা ৩৪৭ জন। তবে বগুড়ার ‘গুরু মা’ কনা হিজড়ার দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তাঁর ভাষ্য, বগুড়ায় অন্তত দেড় হাজার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন।

তিনি বলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ এখনো নানা সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা আরও বিস্তৃত হলে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন।

স্থানীয়ভাবে তৃতীয় লিঙ্গের একটি অংশের বিরুদ্ধে বাড়ি-বাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনাও ঘটেছে। মহাস্থান এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন আহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কনা হিজড়া বলেন, প্রকৃত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কারও কাছে জোর করে টাকা আদায় করেন না। তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান বা বাসাবাড়িতে গিয়ে মানুষের সহযোগিতা চান। তাঁর দাবি, কিছু ব্যক্তি তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয় ব্যবহার করে অপকর্মে জড়িয়ে পুরো জনগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন।

তিনি আরও দাবি করেন, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত একটি গ্রুপকে ইতোমধ্যে বগুড়া থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে।

বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি এলাকায় নিবন্ধিত ‘বলাকা হিজড়া উন্নয়নসংস্থা’র মাধ্যমে পরিচালিত একটি শিক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয় সমাজসেবা অধিদপ্তর।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রকৃত ও অপ্রকৃত উভয় ধরনের হিজড়াদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ওই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সব তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ একই ধরনের পেশায় যুক্ত নন। অনেকেই এখন আত্মকর্মসংস্থান বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাহালু উপজেলার খায়রুল সুন্দরীর মতো অনেকেই বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় ব্যবসা বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। কেউ কেউ ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছেন।

সরকারিভাবে ৫০ বছরের বেশি বয়সী ৩১৬ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ মাসিক ৬০০ টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ৩১ জন শিক্ষার্থী মাসিক ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত শিক্ষাভাতা পেয়ে থাকেন।

কনা হিজড়া জানান, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণকালীন ভাতা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, বগুড়ার হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য আবারও সরকারি প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ভাতা ও আবাসন সুবিধা চালু করা প্রয়োজন।

কনা হিজড়ার অভিযোগ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সনদ পাওয়ার পরও জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য সংশোধন করা যাচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, সরকারি চিকিৎসাসেবা গ্রহণসহ জাতীয় পরিচয়পত্র প্রয়োজন হয়—এমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিচয়পত্রের এই জটিলতা দূর হলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণ সহজ হবে।

বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহা. আতাউর রহমান বলেন, জেলায় মোট ৩৪৭ জন শনাক্তকৃত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের তথ্য রয়েছে।

তিনি জানান, ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য বিভিন্ন গোত্রপ্রধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডাকা হলেও অনেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সনদ নিতে আগ্রহ দেখাননি।

তাঁর ভাষ্য, এই কারণে ২০২১ সালে আত্মকর্মসংস্থান ও মানোন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ফেরত পাঠাতে হয়েছিল। ওই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের প্রতিদিন ৫০০ টাকা ভাতা এবং খাবারের ব্যবস্থাও ছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ সে সময় সমাজসেবা অধিদপ্তরকে জানিয়েছিলেন, তাঁরা প্রতিদিন এর চেয়ে বেশি আয় করেন, তাই ওই ভাতায় প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন না।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের দাবি, বগুড়ার হিজড়া সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সরকারি কর্মসূচি সফল করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যদিকে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিদের প্রত্যাশা, নিবন্ধন, পরিচয়পত্র সংশোধন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হলে তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বদলগাছীতে কলার পাতা কাটা নিয়ে সংঘর্ষ, ছোট ভাইয়ের রডের আঘাতে বড় ভাই নিহত