তরুণদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোর উপায়

তরুণদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে ৮ সহজ উপায়

কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক হবে না—একসময় এমন ধারণা থাকলেও বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বয়স হৃদ্‌রোগের একটি বিষয় হলেও শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রার মতো বিষয়গুলো হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, তামাক ব্যবহার এবং ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত ঝুঁকি। এসব কারণে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও রক্তের চর্বির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যাও তৈরি হতে পারে। এগুলো আবার হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে যে অভ্যাসগুলো জরুরি

তাই শুধু বয়স কম বলে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। বরং তরুণ বয়স থেকেই কিছু অভ্যাস ঠিক করে নিলে ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

প্রথমেই নজর দিতে হবে খাবারের দিকে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম, বীজ, পূর্ণ শস্য ও তুলনামূলকভাবে কম প্রক্রিয়াজাত খাবার রাখার চেষ্টা করা উচিত। অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো দরকার। WHO-এর ২০২৬ সালের স্বাস্থ্যকর খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশনায়ও বৈচিত্র্যপূর্ণ, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বড় একটি সময় বসে থাকা, দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাঁটাচলা না করার অভ্যাস শরীরের জন্য ভালো নয়। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম অথবা ৭৫ মিনিট বেশি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। একবারে অনেকক্ষণ ব্যায়াম করা সম্ভব না হলে প্রতিদিনের সময়কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করেও হাঁটা বা শরীরচর্চা করা যায়।

ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকাও জরুরি। শুধু সিগারেট নয়, তামাকের অন্যান্য ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। WHO জানিয়েছে, তামাক শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করে। তাই তরুণ বয়সে ধূমপান শুরু না করা এবং যারা ধূমপান করেন তাদের ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন

কুয়েতে প্রবাসীদের কোটি টাকা নিয়ে উধাও ‘ইয়েপবিট’ ও ‘বনচ্যাট’, দিশেহারা হাজারো বাংলাদেশি

ঘুমের বিষয়টিও অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত কম ঘুম বা অনিয়মিত ঘুম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য তাদের ‘Life’s Essential 8’ তালিকায় পর্যাপ্ত ঘুমকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। একই তালিকায় স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, নিকোটিন এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন এবং রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও রাখা হয়েছে।

শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের দিকেও নজর রাখা দরকার। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকি বাড়াতে পারে। WHO এসব বিষয়কে হৃদ্‌রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই দ্রুত ওজন কমানোর কোনো কঠোর পদ্ধতির বদলে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও সুষম খাবারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখার চেষ্টা করা ভালো।

রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। এসব সমস্যা অনেক সময় শুরুতে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ তৈরি করে না। ফলে নিজেকে সুস্থ মনে হলেও কারও উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল থাকতে পারে। বিশেষ করে পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে, অতিরিক্ত ওজন থাকলে বা আগে থেকেই ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।

মানসিক চাপের বিষয়টিও একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। কাজের চাপ, ঘুমের অনিয়ম, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত উদ্বেগ—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম এবং নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়ার মতো অভ্যাস তৈরি করা উপকারী হতে পারে। তবে মানসিক চাপ বা উদ্বেগ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। WHO হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সম্ভব হলে অতিরিক্ত দূষণের সময় বাইরে থাকার সময় কমানো এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলা ভালো।

হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায়

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ চিনে রাখা জরুরি

শুধু প্রতিরোধমূলক অভ্যাস করলেই হবে না, জরুরি অবস্থার লক্ষণও জানা দরকার। বুকে চাপ বা অস্বস্তি, শরীরের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব কিংবা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। এমন কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদ্‌রোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে অনেক হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি আচরণগত ও শারীরিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কমানো সম্ভব। তাই হার্ট অ্যাটাক নিয়ে সচেতনতা শুধু বেশি বয়সীদের জন্য নয়,  তরুণদের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য কোনো একটি বিশেষ খাবার বা একটি নির্দিষ্ট অভ্যাসের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, তামাক এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার দিকে নজর রাখার মতো কয়েকটি অভ্যাস একসঙ্গে ধরে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ‘Life’s Essential 8’ কাঠামোতেও এই বিষয়গুলোকে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়েছে।

তরুণ বয়স থেকেই এসব বিষয়ে সচেতন হলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ভালো সুযোগ তৈরি হয়। বয়স কম—এই ধারণায় অসতর্ক না থেকে এখন থেকেই নিজের জীবনযাপন ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।