বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও এসএসসি ফলাফল

এসএসসি ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিখন ঘাটতি ও কারিকুলামের চাপ

এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজারের বেশি। ফলাফলের এই চিত্রের পেছনে দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, কারিকুলামের পরিবর্তন, গণিত ও ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতা এবং মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার মতো বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান নির্ধারণ করা যায় না। তবে এবারের ফলাফলে এমন কিছু দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরির ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি, শিক্ষক সংকট এবং পরিবর্তিত কারিকুলামের চাপ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে।

এসএসসি ফলাফলে শিখন ঘাটতি ও শিক্ষক সংকট

দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতির প্রভাব, বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

শিক্ষাবিদদের আলোচনায় এবারের ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শিখন ঘাটতি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় বড় ধরনের ছেদ পড়ে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন। ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম চালুর পর দশম শ্রেণিতে আবার ভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করতে হয়েছে। ফলে একটি ব্যাচকে মাধ্যমিক পর্যায়েই ভিন্ন ধরনের শিক্ষাক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালামের মতে, মাধ্যমিক পর্যায়ের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা করোনার অভিঘাতে পড়ে। এরপর কারিকুলাম পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতিও ছিল। এসব বিষয় এবারের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তার মতে, ফলাফলকে শুধু খারাপ হিসেবে দেখার পরিবর্তে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সেটি চিহ্নিত করে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

গণিত ও ইংরেজিতে বড় দুর্বলতা

এবারের ফলাফলে গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ২৭ শতাংশ এবং গণিতে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। দুই বিষয়েই গত বছরের তুলনায় ফেলের হার বেড়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, গণিতে শুধু সূত্র মুখস্থ করলেই ভালো করা সম্ভব নয়। নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি মৌলিক ধারণা পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। একইভাবে ইংরেজিতে ব্যাকরণ, রিডিং ও ভাষাগত দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল হলে পরীক্ষায় তার প্রভাব পড়ে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার বলেন, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ কর্মসূচি প্রয়োজন। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পরীক্ষার আগে অল্প সময়ে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে দীর্ঘমেয়াদে শেখার পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এসএসসি পরীক্ষার ফল ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট

মুখস্থ ও গাইডনির্ভর পড়াশোনার চাপ

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে মুখস্থ ও গাইডনির্ভরতা। মূল বই বুঝে শেখার পরিবর্তে গাইড, নোট ও সাজেশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পরিচিত প্রশ্ন এলে উত্তর দেওয়া সম্ভব হলেও প্রশ্নের ধরন পরিবর্তিত হলে অনেক শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, কতটা বুঝেছে, বিশ্লেষণ করতে পারে কি না এবং শেখা বিষয় প্রয়োগ করতে পারে কি না—মূল্যায়নে এসব বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করিয়ে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই কারিকুলামে নির্ধারিত শিখনফলকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশ্ন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান

দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম। এতে একজন শিক্ষককে একাধিক ক্লাস বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অবসরে যাওয়ার পর অনেক প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতার ঘাটতিও তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষক সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বোর্ড পরীক্ষায় ফেল করলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করা যায় না। বিদ্যালয়ে পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম বাস্তবায়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়বদ্ধতার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

গ্রাম ও শহরের শিক্ষাবৈষম্য

এবারের ফলাফলে গ্রাম ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল দুর্বল হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ ও মানের পার্থক্য রয়েছে। করোনার পর শিক্ষার্থীদের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাবও এখনো রয়েছে।

তার মতে, গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

মানবিক বিভাগে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে

নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গ্রুপভিত্তিক ফলাফলেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

আরও পড়ুন

নওগাঁয় ছেলেকে মারতে সন্ত্রাসী ভাড়ার অভিযোগ জামাই-শাশুড়ির বিরুদ্ধে

নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিলেন এমপি ফজলে হুদা বাবুল

মানবিক বিভাগের পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তা, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি এবং শিক্ষক সংকটের বিষয়গুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।

দাখিল ও কারিগরিতেও ফল নিয়ে প্রশ্ন

সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি দাখিল ও কারিগরি শিক্ষাতেও পাসের হার নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এবার দাখিলে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ক্ষেত্রেও শিক্ষক, অবকাঠামো, ব্যবহারিক শিক্ষা, একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার মানোন্নয়ন

এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, ফলাফল ভালো করার জন্য শুধু পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি বাড়ালেই হবে না। প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা তৈরি করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত অনুশীলন এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে আলাদা উদ্যোগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে এবারের এসএসসি ফলাফল দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার বেশ কিছু পুরোনো সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা প্রশাসনের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে এসব দুর্বলতার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া।

শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা শিখছে এবং সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারছে—শিক্ষার মান নির্ধারণে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।