ভুল অস্ত্রোপচারে কৃষকের মৃত্যুর অভিযোগ

নাটোরে ভুল অস্ত্রোপচারে কৃষকের মৃত্যু, পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে আরও তিন জন

নাটোরের গুরুদাসপুরে ভুল অস্ত্রোপচারচিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক কৃষকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। একই চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারের পর আরও তিন রোগী গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনেরা। তাদের কারও ক্ষতস্থানে পচন ধরেছে, কারও অস্ত্রোপচারের জায়গা থেকে দীর্ঘদিন ধরে পুঁজ বের হচ্ছে। এমনকি একজন রোগীর পা কেটে ফেলার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

এ ঘটনায় চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও বিচার দাবিতে শনিবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। অভিযুক্ত চিকিৎসক গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তার কাছে চিকিৎসা নেওয়ার পর তারা একের পর এক জটিলতার মুখে পড়েছেন।

ভুল অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণে ভুগছেন রোগী

ভুল অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের শারীরিক জটিলতার অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের মধ্যে গুরুদাসপুর পৌর এলাকার চাঁচকৈড় মধ্যমপাড়া মহল্লার নাজিমুদ্দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার পর চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের কাছে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, বনপাড়ার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের কয়েক দিন পর থেকেই ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করে। পরে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা ও ড্রেসিং করেও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

নাজিমুদ্দিন জানান, চিকিৎসার পেছনে তার প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রায় আট মাস ধরে চিকিৎসা নেওয়ার পরও ক্ষতস্থানের সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। বর্তমানে তিনি অন্য একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ওই চিকিৎসকের মতে, নাজিমুদ্দিনের অস্ত্রোপচারে ত্রুটি ছিল এবং বর্তমানে তার পা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পা কেটে ফেলার আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

একই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছিলেন বড়াইগ্রামের জহুরা বেগম। পড়ে গিয়ে তার বাম হাতের কবজির কাছে হাড় ভেঙে গেলে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর তার হাতে সংক্রমণ দেখা দেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন। চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বর্তমানে তার হাত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। কবজিও ঠিকমতো বাঁকাতে পারেন না বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, গুরুদাসপুরের আনোয়ারা বেগমের পায়ের ভুল অস্ত্রোপচার নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই তার ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে থাকে। পরবর্তীতে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে পরীক্ষায় তার হাড়ের ভেতরে ড্রিল মেশিনের ভাঙা অংশ থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে চিকিৎসকেরা জানান। অস্ত্রোপচারের সময় ওই অংশটি হাড়ের ভেতরে থেকে গিয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঢাকার একটি হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক আয়ুব আলী জানান, আনোয়ারা বেগমকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তার অস্ত্রোপচারের স্থানে পচন ধরেছিল এবং সংক্রমণ হাড় পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। পরীক্ষায় হাড়ের ভেতরে ড্রিল মেশিনের একটি অংশ থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে তিনি জানান।

ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে চিকিৎসকের বিচারের দাবি

এদিকে, কাঁধের টিউমার অস্ত্রোপচার করাতে গিয়ে ওসমান গণি নামে এক কৃষকের মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, জুন মাসের শুরুতে তাকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক অস্ত্রোপচার শুরু করার কিছু সময় পর অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। পরে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, ভুল অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই ওসমান গণির মৃত্যু হয়েছে। নিহত কৃষকের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনেরা শনিবার চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসার পর গুরুতর জটিলতা দেখা দিলেও যথাযথ দায়িত্ব নেওয়া হয়নি। কেউ দীর্ঘদিন ধরে অসহ্য ব্যথায় ভুগছেন, আবার কেউ পা বা অঙ্গ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিনি কাউকে ভুল চিকিৎসা দেননি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

নাটোরের সিভিল সার্জন মশিউর রহমান জানান, চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের চিকিৎসায় কোনো রোগীর মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুলের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চিকিৎসা নেওয়ার আগে রোগী ও স্বজনদের চিকিৎসকের যোগ্যতা, হাসপাতাল বা ক্লিনিকের অনুমোদন এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গুরুদাসপুরে পাগলা কুকুরের কামড়ে আহত ৬ শিশু