কুয়েতে ইয়েপবিট ও বনচ্যাটে অর্থ হারানোর অভিযোগ

কুয়েতে ইয়েপবিট ও বনচ্যাটে বিনিয়োগ করে কোটি টাকা হারানোর অভিযোগ, বিপাকে হাজারো প্রবাসী

কুয়েতে বসবাসরত বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইনের হাজার হাজার প্রবাসী একটি অনলাইনভিত্তিক বিনিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কুয়েতে ইয়েপবিট (Yepbit) নামের একটি অ্যাপ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘বনচ্যাট’ (BonChat) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তারা সেই অর্থ আর উত্তোলন করতে পারছেন না। এতে করে প্রবাসীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রত্যেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি অর্থ এই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করেছিলেন। বিনিয়োগের পর প্রতিদিন সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে দুইবার একটি পিন কোড দেওয়া হতো। ব্যবহারকারীরা সেই পিন কোড অ্যাপের নির্ধারিত স্থানে কপি-পেস্ট করলে তাদের অ্যাকাউন্টে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার যোগ হতো। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত আয় হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হওয়ায় অনেকেই আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেন।

শুধু তাই নয়, নতুন সদস্য যুক্ত করার বিনিময়ে অতিরিক্ত কমিশনের সুযোগও ছিল বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে অনেকেই নিজেদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী ও পরিচিতজনদেরও এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কুয়েতে ইয়েপবিট ও বনচ্যাটে অর্থ হারানোর অভিযোগে উদ্বিগ্ন প্রবাসী

কুয়েতে ইয়েপবিটের মাধ্যমে অর্থ হারানোর অভিযোগ, টাকা তুলতে পারছেন না প্রবাসীরা

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুরুতে নিয়মিতভাবে অর্থ উত্তোলন করা সম্ভব হলেও গত ১০ জুলাইয়ের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেকেই টাকা উত্তোলনের আবেদন করলেও তা আর সম্পন্ন হয়নি। কারও আবেদন দীর্ঘ সময় ধরে প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে, আবার কেউ একেবারেই অর্থ তুলতে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাদের দাবি, হাজার হাজার প্রবাসীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পর কুয়েতে ইয়েপবিট ও বনচ্যাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মগোপন করেছেন। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না।

ভুক্তভোগী আব্দুর রহমান জানান, শুরু থেকেই তার কিছুটা সন্দেহ ছিল। তবে একই বাসায় থাকা কয়েকজনকে নিয়মিত টাকা তুলতে দেখেছিলেন। পাশাপাশি তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বারবার অনুরোধ করায় তিনি প্রায় ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেন।

তিনি বলেন, “মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই আমার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০০ ডলার জমা হয়েছিল। আমি অন্য একজনের কাছ থেকে ধার করে টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন সেই টাকাও আটকে গেছে। কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”

আরেক ভুক্তভোগী সুমন শেট বলেন, তার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জমা হয়েছিল। শুরুতে কয়েকবার টাকা তুলতে পারায় প্ল্যাটফর্মটির ওপর তার আস্থা তৈরি হয়েছিল। পরে বেশি মুনাফার আশায় তিনি আর অর্থ উত্তোলন করেননি।

তিনি বলেন, “ভাবছিলাম আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলে লাভ বাড়বে। কিন্তু এখন দেখি পুরো টাকাই চলে গেছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমি আমার পরিচিত অনেক মানুষকে এখানে যুক্ত করেছিলাম। এখন সবাই আমাকে দায়ী করছে। এই ঘটনার কারণে অনেক বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট হয়ে গেছে।”

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কুয়েত বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, কোনো অনলাইনভিত্তিক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে অর্থ দেওয়ার আগে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, লাইসেন্স, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং অর্থ উত্তোলনের নিয়ম ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, প্রতারক চক্র প্রায়ই নতুন নামে বাজারে আসে। কয়েক বছর আগে ‘এমটিএফ’ (MTF) নামেও একই ধরনের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বহু মানুষ অর্থ হারিয়েছিলেন। এবারও ভিন্ন নামে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

মঈন উদ্দিন সরকারের ভাষ্য, পরিচিত মানুষের কথায় বা দ্রুত লাভের আশায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে নতুন সদস্য যুক্ত করলে অতিরিক্ত কমিশনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে অর্থ হারানো প্রবাসীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কেউ ঋণ করে বিনিয়োগ করেছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের সঞ্চয় এই প্ল্যাটফর্মে রেখেছিলেন। টাকা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা এখন কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কুয়েতে ইয়েপবিট ও বনচ্যাটের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তারা শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, অনেকের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিচিতদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার কারণে অনেকেই এখন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

বগুড়ায় ডিবি হেফাজতে হত্যা মামলার আসামির আত্মহত্যা