বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা, সর্বস্ব হারিয়ে ঘরছাড়া সাইফুল

বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা, সর্বস্ব হারিয়ে এখন ঘরছাড়া নাটোরের সাইফুল

ভালো বেতনে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার শিকার নাটোরের বাগাতিপাড়ার মো. সাইফুল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি তো পানইনি, বরং প্রায় এক মাস বন্দী থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। দেশে ফেরার পরও শেষ হয়নি তাঁর দুর্ভোগ। টাকা ও জমি ফেরত চাইতে গিয়ে হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগে এখন ঘরছাড়া হয়ে দিন কাটছে তাঁর।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

সাইফুল ইসলাম উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের কালিকাপুর দহপাড়া গ্রামের মো. আকবর আলীর ছেলে। সোমবার (৩১ আগস্ট) বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সৌদি আরবে যাওয়ার পর নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং দেশে ফিরে নতুন করে হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ তুলে ধরেন।

সৌদি আরবে চাকরির প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফেরা সাইফুল ইসলাম

বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান সাইফুল

সাইফুলের দাবি, কালিকাপুর দহপাড়া গ্রামের মৃত কালাচাঁদের ছেলে প্রবাসী শাকিল আলী তাঁকে সৌদি আরবের একটি চকলেট কোম্পানিতে মাসিক ৫৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। ভালো বেতনের চাকরির আশ্বাসে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেন তিনি।

চাকরির আশ্বাসে বিভিন্ন সময়ে শাকিল আলীর হাতে নগদ ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন বলে জানান সাইফুল। পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাড় করতে বজরাপুর মৌজায় নিজের নামে থাকা ৪২ শতক ধানি জমি ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে কট বন্ধক হিসেবে লিখে দেন।

সব মিলিয়ে নগদ টাকা ও জমির মূল্য হিসেবে ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার সম্পদ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবে যান সাইফুল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল ভিন্ন বাস্তবতা। তাঁর অভিযোগ, প্রতিশ্রুত চকলেট কোম্পানিতে চাকরি না দিয়ে তাঁকে একটি কক্ষে প্রায় এক মাস আটকে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

আরও পড়ুন

মান্দায় আর্জেন্টিনার পতাকা নামাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, কিশোরের মৃত্যু

বন্দী অবস্থায় দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে আরও ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলেও জানান সাইফুল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকমতো খাবার ও পানি দেওয়া হতো না। এমন পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে বাঁচার জন্য টয়লেটের পানি পান করতে হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

সাইফুল জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার পর তাঁর আকামা বা কাজের অনুমতিপত্র করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটিও করে দেওয়া হয়নি। পরে তিন মাসের ভিসার মেয়াদ শেষ হলে সৌদি পুলিশ তাঁকে আটক করে। এরপর গত ২২ জুন তাঁকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

দেশে ফেরার পর নিজের দেওয়া টাকা এবং বন্ধক রাখা জমি ফেরত চাইতে গিয়ে নতুন সমস্যার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ সাইফুলের। তাঁর দাবি, টাকা ও জমি ফেরত চাওয়ার পর অভিযুক্তরা উল্টো তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা অভিযোগ করেন।

সাইফুলের অভিযোগ, গত ১২ আগস্ট অভিযুক্তরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে আরও ৩ লাখ টাকা দাবি করেন। তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

এর দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৪ আগস্ট কয়েকজন ভাড়াটে লোক নিয়ে তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন সাইফুল। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া মীমাংসার কথা বলে তাঁকে থানায় ডেকে নিয়ে এএসআই দুলালের উপস্থিতিতে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সাইফুল।

তিনি বলেন, পরিবারের ভাগ্য বদলানোর আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দেশে ফিরে নিজের টাকা ও জমি ফেরত চাইতে গিয়েও এখন হুমকির মুখে পড়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে সাইফুল এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে নেওয়া টাকা ও জমি ফেরত এবং শাকিল আলীসহ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল হোসেন বলেন, সাইফুল ইসলামের জমির বন্ধকনামায় তিনি সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে আর্থিক লেনদেনের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। বিদেশে যাওয়ার বিষয়েই সাইফুল জমিটি বন্ধক দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

কামাল হোসেন থানায় সালিশ এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনার কথাও স্বীকার করেন।

এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন চন্দ্র দাস বলেন, গতকাল রোববার (৩০ আগস্ট) এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছেন তাঁরা। তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগ তুলে সাইফুল যে বিষয়গুলো জানিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে বিদেশে পাঠানোর নামে টাকা নেওয়া, চাকরি না পাওয়া, সৌদি আরবে আটকে রাখার অভিযোগ এবং দেশে ফিরে টাকা ও জমি ফেরত চাইতে গিয়ে হুমকির বিষয় রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর আইনগত সত্যতা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সাইফুলের দাবি, বিদেশে যাওয়ার সময় যে অর্থ ও জমি তিনি দিয়েছেন, তা ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বর্তমানে নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।