নওগাঁয় আউশ ধানের দাম কমে হতাশ কৃষক

নওগাঁয় আউশ ধানের ফলন ভালো, দামে হতাশ কৃষক

 

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নওগাঁয় আউশ ধানের দাম কমে যাওয়ায় ভালো ফলন পেয়েও হতাশ কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন হাটে জিরাশাইল, কাটারি ও বিআর-২৮ জাতের ধান প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় জাতভেদে প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

রাণীনগর উপজেলার কালিগ্রাম গ্রামের কৃষক মোজাফফর হোসেন নতুন তোলা আউশ ধান বিক্রি করতে আবাদপুকুর হাটে এসেছিলেন। ভালো ফলনের আনন্দ থাকলেও বাজারে ধানের দাম শুনে সেই আনন্দ ম্লান হয়ে যায়।

মোজাফফর হোসেন বলেন, ধানের দাম খুব কম। এ দামে বিক্রি করলে চাষের খরচই উঠবে না। কিন্তু সংসারের খরচ চালাতে ধান বিক্রি করতেই হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন মহাদেবপুর উপজেলার মহিষবাতান গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন। তিনি ১২ মণ জিরাশাইল ধান নিয়ে উপজেলা সদরের হাটে গিয়ে প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।

জালাল উদ্দিন বলেন, ধান বাজারে আনতে ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন ধান বিক্রি না করে বাড়িতে নিয়ে গেলেও আবার ভাড়া লাগবে। অথচ গত বছর একই ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন।

নওগাঁর হাটে আউশ ধান বিক্রি করছেন কৃষক

নওগাঁয় আউশ ধানের দামে ধস, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৪৭৩ হেক্টরে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রতি একরে আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে ৬৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সে হিসাবে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ২১ হাজার টাকা।

নওগাঁয় আউশ ধানের দামে ধস, উঠছে না উৎপাদন খরচ

অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন হাটে জিরাশাইল, কাটারি ও বিআর-২৮ জাতের ধান ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচের পাশাপাশি সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে।

কৃষকদের হিসাবে, বিঘাপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ২২ মণ ধান পাওয়া গেলেও বর্তমান বাজারদরে তা বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় ১৬ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ফলে ভালো ফলন হলেও অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচই উঠছে না।

ধান কাটার পর কৃষকদের অনেকের সামনে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়। কারও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়, আবার কারও দিতে হয় জমির বর্গার টাকা। পাশাপাশি সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচও মেটাতে হয়। ফলে বাজারদর কম হলেও অনেক কৃষকের পক্ষে ধান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

মান্দা উপজেলার মৈণম গ্রামের কৃষক দিলীপ দাস চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ চাষ করেছেন। চাষের জন্য তিনি সমিতি থেকে ঋণও নিয়েছেন।

দিলীপ দাস বলেন, চার বিঘা জমিতে আউশ চাষ করতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কমে যাওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ এবং সংসারের খরচ মেটানো নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

আরও পড়ুন

মহাদেবপুরে পুকুরে বিষ প্রয়োগ, ৪০ লাখ টাকার মাছ নিধন

নওগাঁর চকগৌরি এলাকার ধান ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ধানের বাজার নিম্নমুখী। আউশ ধান বাজারে আসার পর থেকেই দর কমতে শুরু করেছে। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

তিনি জানান, বর্তমানে কাটারি ধান ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা, জিরাশাইল ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং বিআর-২৮ জাতের ধান ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি একর আউশ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে কৃষক লাভবান হতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদক পর্যায়ে ধানের দাম কমলেও এর প্রভাব স্থানীয় চালের বাজারে পড়ছে না। মোটা ও সরু জাতের চাল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে দেশে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে।

সামনে আমন মৌসুম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমন মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এবার আউশের আবাদ বেড়েছে এবং কৃষকের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে নওগাঁয় আউশ ধানের দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে চাপে পড়েছেন কৃষকরা। তাঁদের বক্তব্য, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে ভালো ফলনও কৃষকের জন্য কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এনে দিচ্ছে না।