মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস

দুই হাত নেই,মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস, শিক্ষক হতে চায় রিয়াদ

 

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রিয়াদ হাসান দুই হাত না থাকলেও থেমে থাকেনি পড়াশোনা। মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস করেছে সে। এবারের পরীক্ষায় জিপিএ ২.৯৪ পেয়েছে রিয়াদ। তবে প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় সে।

রিয়াদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় মসজিদের ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুতের মেইন লাইনের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় সে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।

দুই হাত হারানোর পরও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়নি রিয়াদ। বরং মুখ দিয়ে কলম ধরে লেখা আয়ত্ত করে। সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিতে থাকে সে। শেষ পর্যন্ত মুখ দিয়ে লিখেই দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে রিয়াদ।

নিয়ামতপুরের রিয়াদ হাসানের দাখিল পরীক্ষায় সাফল্য

দুই হাত হারিয়েও থামেনি রিয়াদের পড়াশোনা, মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি রিয়াদের গভীর আগ্রহ ছিল। বালিচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকেরাও তাকে বিশেষভাবে উৎসাহ দিতেন। পরে গ্রামের পাশের বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয় সে। সেখান থেকেই এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে।

বর্তমানে মুখ দিয়ে লেখালেখি থেকে শুরু করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে করতে পারে রিয়াদ। শুধু পড়াশোনা নয়, দৈনন্দিন অনেক কাজও নিজে করার চেষ্টা করে সে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রিয়াদ হাসান বলে, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক হব। দুই হাত হারিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও মুখ দিয়ে লিখে এবার দাখিল পরীক্ষা পাস করেছি। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল করতে পারিনি।’

রিয়াদ আরও বলে, ‘আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। আমি উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে একটি চাকরি করতে চাই। সরকার যদি আমার দিকে একটু নজর দেয় এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, তাহলে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে পরিবারের হাল ধরতে চাই।’

আরও পড়ুন

বগুড়ায় ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ

রিয়াদের ছোট ভাই রাহাদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের দুই হাত নেই। চলাফেরাতেও অনেক কষ্ট হয়। সে মুখ দিয়ে লেখাপড়া করে। অনেক সময় আমি তাকে হাতে করে ভাত খাওয়াই।’

রিয়াদের মা দেলরোবা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে অনেক কষ্টে দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। অভাবের মধ্যেও আমরা চেষ্টা করেছি ছেলেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিয়াদ লেখাপড়া শেষ করে যদি সরকারি সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তাহলে আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম সফল হবে।’

বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার নুরুল হক বলেন, ‘রিয়াদ অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তার অদম্য মনোবলের প্রমাণ। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

দুই হাত হারানোর পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস করার ঘটনায় রিয়াদের শিক্ষাজীবনের সংগ্রাম সামনে এসেছে। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার।

রিয়াদের স্বপ্ন, পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে একদিন শিক্ষক হওয়া। নিজে শিক্ষক হয়ে অন্যদের আলোর পথ দেখাতে চায় সে। পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে একটি চাকরির প্রত্যাশাও রয়েছে তার।