নওগাঁর সাপাহারে ‘অফ সিজনে’ কাটিমন আমের জমজমাট বাজার

নওগাঁয় ‘অফ সিজনেও’ আমের বাজার ধরে রেখেছে কাটিমন

 

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নওগাঁয় আমের প্রচলিত মৌসুম অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আম্রপালি, নাক ফজলি, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া ও গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম এখন আর বাজারে নেই। তবে মৌসুম শেষ হলেও সাপাহারে কাটিমন আম নিয়ে এখনো জমজমাট বাজার বসছে। বারোমাসি এই জাতের আম দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি স্বাদেও আলাদা হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও দেখা যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে সাপাহারের বড় আমের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনে করে কাটিমন আম নিয়ে এসেছেন। বাজারে সারি সারি করে সাজানো রয়েছে আম। আমের মৌসুম শেষ হওয়ার পরও এমন বাজার দেখে স্থানীয়রাও অবাক হয়েছেন।

নওগাঁর সাপাহারে বারোমাসি কাটিমন আম নিয়ে কৃষকদের বাজার

‘অফ সিজনে’ কাটিমন আমের দাপট, চাষ বাড়াচ্ছেন নওগাঁর কৃষক

উপজেলার হরিপুরের আমচাষি মনসুর আলী ৫ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। তিনি জানান, এবার ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি মণ আমের দাম ৮ হাজার টাকা চাইলেও ব্যবসায়ীরা সাড়ে ৬ হাজার টাকা দাম বলছেন। ৭ হাজার টাকা হলে তিনি বিক্রি করবেন বলে জানান।

বালুকাডাঙ্গার আমচাষি রেজাউল ও সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এ সময় অন্যান্য জাতের আম না থাকায় কাটিমনের চাহিদা বেশি। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। আগামীতে এই জাতের আমের চাষ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

বাড়ির জন্য কাটিমন আম কিনতে আসা প্রদীপ বলেন, এ সময়ে এত আমের বাজার আগে দেখেননি। বাজারে অন্য আম না থাকলেও সামনে এত সুন্দর আম দেখে কিনতে ইচ্ছা হয়। একই কথা জানান ক্রেতা নয়ন ও সিরাজ। তাদের মতে, বাজার দেখে মনে হচ্ছে আমের মৌসুম চলছে।

সারোগডাঙ্গা এলাকার আমচাষি হাফিজুর রহমান ১৬ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। তাঁর বাগানে প্রতি মণ আম প্রায় ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, বাগানে এখনো মুকুল রয়েছে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত আম পাওয়া যেতে পারে।

হাফিজুর রহমান ২০১৯ সালে কাটিমন চাষ শুরু করেন। ২০২১ সাল থেকে তাঁর বাগানে ফলন আসতে শুরু করে। বারোমাসি হওয়ায় তাঁর বাগানে সারা বছর ১০ থেকে ১২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নিশ্চিন্তপুর এলাকার আমচাষি নাসির উদ্দিনও ২০১৯ সালে কাটিমনের চারা লাগান। গত বছর ১৫ বিঘায় চাষ করলেও এবার তিনি ৩৭ বিঘা জমিতে এই জাতের আম চাষ করেছেন। তাঁর বাগানে ৯ জন কাজ করছেন। বাজারে আমের দাম প্রকারভেদে ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন

মান্দায় অবৈধ ইটভাটায় ১ লাখ টাকা জরিমানা, নির্মাণকাজ বন্ধ

টেংরাকুড়ি গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন ৬০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের বাগান করেছেন। তাঁর হিসাবে প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ মণ, কখনো ৩০ থেকে ৩৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়। বর্তমানে প্রতি মণ ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এবার তাঁর বাগান থেকে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছেন তিনি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর ও সমর সাহা জানান, এবার সাপাহারের বাজারে কাটিমন আমের সরবরাহ অনেক বেড়েছে। নওগাঁর আত্রাই, পোরশার সারাইগাছি, ধামইরহাট ও পত্নীতলা থেকেও কৃষকরা আম নিয়ে সাপাহারে আসছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা ও অন্যান্য উপজেলাতেও বাণিজ্যিকভাবে কাটিমন চাষ হচ্ছে। সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাপলা খাতুন জানান, বর্তমানে এ উপজেলায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হচ্ছে, যা আগে ছিল ৯৭ হেক্টর। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রেজাউল করিম জানান, এ বছর জেলায় মোট ২৫৫ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ১৯০ হেক্টর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে সাপাহারে।

তিনি জানান, অন্যান্য জাতের আম নির্দিষ্ট সময়ে পরিপক্ব হলেও কাটিমনের বিশেষত্ব হলো কৃষক বছরে দুই থেকে তিনবার নিজের সুবিধামতো সময়ে আম সংগ্রহ করতে পারেন। এই জাতের আম নওগাঁ থেকে দেশের বিভিন্ন সুপারশপের পাশাপাশি বিদেশেও যাচ্ছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে কাটিমনের হেক্টরপ্রতি ফলন ১২ থেকে ১৫ টন। ২৫৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি কেজি আমের সর্বনিম্ন দাম ১৫০ টাকা, গড় ১৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০০ টাকা ধরে মোট বাজারমূল্য প্রায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, কাটিমন আম সারা বছর চাষ করা সম্ভব এবং এতে কৃষকরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। এ কারণে গত বছরের তুলনায় এবার চাষ বেড়েছে। কৃষকদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রচলিত আমের মৌসুম শেষ হয়ে গেলেও কাটিমনের কারণে নওগাঁর বাজারে এখনো আমের সরবরাহ রয়েছে। বিশেষ করে সাপাহারে জমে ওঠা এই বাজার কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে, পাশাপাশি মৌসুমের বাইরে আম খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতারাও।