নওগাঁ মা ছেলে বিরোধ: ছেলেকে মারতে সন্ত্রাসী ভাড়ার অভিযোগ

নওগাঁয় আবারও ছেলেকে মারতে লোক ভাড়া করার অভিযোগ জামাই-শাশুড়ির বিরুদ্ধে

নওগাঁ শহরের আলোচিত কবিরাজ পরিবারের মা ছেলে বিরোধ কোনোভাবেই থামছে না। একের পর এক মামলা, পাল্টা মামলা, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, জমি নিয়ে বিরোধ এবং পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি—সব মিলিয়ে ঘটনাগুলো এখন নওগাঁজুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, পারিবারিকভাবে মীমাংসার পথে এগোতে থাকা এই বিরোধে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি বারবার জটিল হয়ে উঠছে। তাদের অভিযোগ, পরিবারের জামাইয়ের প্ররোচনায় মা ও ছেলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ানো হচ্ছে এবং পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সর্বশেষ জমি পরিমাপের দিন ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী ভাড়া করে আনার অভিযোগও তুলেছেন তারা, যা এই মা ছেলে বিরোধ-কে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

নওগাঁ সদর উপজেলায় জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ ও হামলার অভিযোগ

নওগাঁয় মা ছেলে বিরোধ, জমি পরিমাপের দিন যা ঘটেছিল

মামলার নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জুলাই নওগাঁ সদর উপজেলার ভাঙ্গা মসজিদ মোড় এলাকায় কুমুড়িয়া মৌজার ১১৬ নম্বর খতিয়ানের ৯০৮ ও ৯০৯ নম্বর দাগভুক্ত প্রায় ৩ একর ১০ শতক জমি নিরপেক্ষভাবে পরিমাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মরহুম আমিনুল ইসলাম কবিরাজের একমাত্র ছেলে জুমাতুল ইসলাম সৌরভ, তার দুই বোনের অংশ এবং মা বিলকিস আক্তারের অংশ আইনগতভাবে নির্ধারণের লক্ষ্যে কয়েকজন আইনজীবী, স্থানীয় সার্ভেয়ার, পরিবারের জ্যেষ্ঠ দুই চাচা, ফুফুসহ পরিবারের সদস্য এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সেদিন মাপজোক চলছিল।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিলকিস আক্তার উপস্থিত থাকলেও তিনি মাঝেমধ্যে মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে আবু রায়হান সনেটসহ ৬ থেকে ৭ জন ঘটনাস্থলে এসে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে সনেট ধারালো অস্ত্র নিয়ে সৌরভের দিকে আক্রমণের চেষ্টা করলে তার চাচা বাধা দেন। উপস্থিত লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র এবং একটি মোটরসাইকেল ফেলে রেখে যায়। পরে নওগাঁ সদর মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সেগুলো জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়।

মামলা আমলে না নেওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারের হতাশা

পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও মামলা গ্রহণে বিলম্ব করা হয়। পরে তাদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী গত ২৭ জুলাই নওগাঁর বিজ্ঞ ১ নম্বর আমলি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়েরের আবেদন করা হলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন তারা। এতে পরিবারটি হতাশা প্রকাশ করেছে।

মা ও জামাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দুজনেরই অস্বীকার

এদিকে, ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে নওগাঁ সদর হাসপাতালের আরএমও আবুজার গাফ্ফারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন এবং এই মা ছেলে বিরোধ-এ প্রভাব বিস্তার করছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জামাই আরএমও আবুজার গাফ্ফার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো লোক পাঠাননি বা এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

আরও পড়ুন

ডাবের পানিতে চেতনানাশক মিশিয়ে অটোরিকশা ছিনতাই, নওগাঁয় চার প্রতারক গ্রেপ্তার

জুমাতুল ইসলাম সৌরভের মা বিলকিস আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনিও অস্বীকার করে বলেন, এসব লোকজন তার কাছের ও পরিচিত হলেও তাদেরকে তিনি সেখানে আসতে বলেননি বা ডাকেননি। তারা নিজেদের থেকেই আসতে পারে বলে সকলের সামনে জানান তিনি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আবু রায়হান সনেট নওগাঁ সদর থানার চিহ্নিত চুরিসহ একাধিক মামলার আসামি, যেসব মামলা নওগাঁ কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।

একাধিক নওগাঁবাসী জানান, নওগাঁ সদর হাসপাতালের আরএমও আবুজার গাফ্ফার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে একই হাসপাতালে বহাল আছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলটির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে এমপি-মন্ত্রীর প্রায় সকলের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়ে দাপটের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে বহাল রয়েছেন। বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বর্তমান এমপির সঙ্গেও সুসম্পর্ক স্থাপন করে একইভাবে বহাল তবিয়তে সেই হাসপাতালেই রয়ে গেছেন। এতে নওগাঁর জনমনে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া চলছে।

স্থানীয়রা জানান, এর আগেও ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে এসব ছেলেদেরকেই বিলকিস আক্তার ও তার জামাই ভাড়া করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে; এখন তারা তা অস্বীকার করছেন মাত্র। প্রায়ই সময়ে সনেটসহ এসব ছেলেদেরকে বিলকিস আক্তার ও তার জামাই আবুজার গাফ্ফারের আশপাশে দেখা যায় বলে জানান এলাকাবাসী। তারা আরও জানান, নিজ ছেলের বিরুদ্ধে সম্পত্তির লোভে এমন নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিবাদ বিলকিস আক্তারের সামনেই করেন উপস্থিত এলাকাবাসী।

দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই নওগাঁ মা ছেলে বিরোধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। নওগাঁবাসীর প্রত্যাশা, এই পারিবারিক বিরোধ যেন আর কোনো সহিংসতার দিকে না গড়ায় এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর স্থায়ী সমাধান হোক।