মান্দায় সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, কোটি টাকার কাজে বালুর অভিযোগ

মান্দায় কোটি টাকার সড়কে ৮০ শতাংশই বালু, নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ

 

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নওগাঁর মান্দায় সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, সড়কের বেস তৈরিতে পরিত্যক্ত ইটভাটার নিম্নমানের ও নম্বরবিহীন ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সঙ্গে খোয়ার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি বালু মেশানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মান্দা উপজেলার ওহেদ পাগলার মোড় থেকে ক্লিনিকের মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারকাজ চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় এক কোটি টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করছে বরেন্দ্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মিলন’।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের বেস নির্মাণে ব্যবহৃত ইটের খোয়ার বড় অংশই পরিত্যক্ত ইটভাটার নিম্নমানের ও নম্বরবিহীন ইট থেকে তৈরি। এসব খোয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত পরিমাণ বালু মিশিয়ে সড়কের বেস তৈরি করা হচ্ছে।

তাঁদের দাবি, বেস তৈরির কাজে আনুমানিক ৮০ শতাংশ বালু এবং মাত্র ২০ শতাংশ খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের সিডিউল ও প্রাক্কলনে নির্ধারিত উপকরণের অনুপাত ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সরকারি অর্থে নির্মাণ করা সড়কের ভিত্তি যদি নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়। বর্ষাকালে পানি জমলে কিংবা ভারী যানবাহন চলাচল করলে সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তাঁরা মনে করছেন।

মান্দায় সড়কের বেস নির্মাণে অতিরিক্ত বালু ব্যবহারের অভিযোগ

মান্দায় সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, এলজিইডির কর্মীর বক্তব্যেও ইটের মান নিয়ে প্রশ্ন

কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যেই মান্দা উপজেলা এলজিইডির কার্য সহকারী উজ্জ্বল কুমার ব্যবহৃত ইটের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, ব্যবহৃত ইটের মান অত্যন্ত খারাপ। সিডিউল অনুযায়ী কাজ না হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এলজিইডির মাঠপর্যায়ের একজন কর্মীর এমন বক্তব্যের পরও কাজ চলমান থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, সিডিউল অনুযায়ী কাজ না হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও নির্মাণকাজে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

আরও পড়ুন

মান্দায় ভুয়া পরিচয়ে বিয়ে, ৪ মাস পর তরুণীকে নিয়ে উধাও যুবক

তবে মান্দায় সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মিলন’-এর স্বত্বাধিকারী।

তাঁর দাবি, সিডিউল ও প্রাক্কলন অনুযায়ী নিয়ম মেনেই সড়কের কাজ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

মান্দায় সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রকৌশলীর

মান্দা উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের বলেন, কাজে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সিডিউলবহির্ভূত বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নজরদারির মধ্যেই যদি নিম্নমানের ইটের খোয়া ও অতিরিক্ত বালু ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে না কেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে তদারকি কতটা নিরপেক্ষ হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

এমনকি উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মিলন’-এর কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট যোগাযোগ বা আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সচেতন মহলের মতে, শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করলেই হবে না। প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সড়কের কাজের মান নিশ্চিত করতে দ্রুত নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ব্যবহৃত ইটের খোয়া ও বালুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।

তাঁদের মতে, প্রকল্পের সিডিউল ও প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব কাজের তুলনা এবং নির্মাণকাজের পরিমাপ পুনঃযাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে। সড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে আবারও একই সড়ক সংস্কারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

এলাকাবাসীর দাবি, তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মিলন’-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তদারকির দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান সড়কটির নির্মাণকাজ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ এখন তদন্তের অপেক্ষায়। নির্মাণসামগ্রীর মান ও ব্যবহারের অনুপাত যাচাই করলেই মান্দায় সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।v